দেশ ভাগ হল দুই ভাগে
প্রাধানমন্ত্রি নরেন্দ্র মোদীর মুদ্রাহিতকরণ সিদ্ধান্ত আজ কাল আর খবরে আসে না। দেশ জুড়ে কমতে লেগেছে এ টি এম এর লাইন। ব্যাঙ্কের শাখা গুলতেও কমেছে মানুষের ভীড় যদিও রোদে দাঁড়িয়ে দেহত্যাগ করতে হয়েছে বেশ কিছু প্রবীণ নাগরিককে। প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ ভাবে নোট বাতিলের সাথে জড়িত মৃত্যু হয়েছে মোট ৩৩ জনের। কেন এইরূপ হেনস্থা তার কোন জবাব নেই। হেনস্থা যে শেষ হয়ে গেছে তা নয়। মানুষের আসুবিধে বুঝতে শহরতলি ছেড়ে গ্রাম বেড়িয়ে আসতে হয়। সেই সমস্ত গ্রাম যেখানে ২ কিলোমিটার অবধি কোন ব্যাঙ্ক নেই। হাতে পাঁচটা এ টি এম কার্ড থাকলেও শুক্রবার হাটে নেই তা ব্যাবহার করার পরিষেবা। সেই সমস্ত নিরক্ষর চাষি, যারা এখনও সই মুখস্ত করে উঠতে পারে নি, বা আদিবাসী সম্প্রদায় যারা হঠাৎ করে একদিন জানতে পারে যে তাদের ঘরের সমস্ত পাঁচশ আর হাজার টাকা কাগজ হয়ে গেছে।
'প্রধানমন্ত্রী জন-ধন যোজনার' অধিনে পশ্চিম বাংলায় এক কোটি নব্বই লাখের বেশি RuPay ডেবিট কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। বিভিন্ন বাঙ্কের মোবাইল ভ্যান প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় গিয়ে প্রচার চালিয়ে অনেক সংক্ষক মানুষকে বাঙ্কিং পরিষেবার আধিনে নিয়ে আসে। শুধুমাত্র আধার কার্ড দিয়ে শূন্য ব্যালেন্সে বাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত বাঙ্কে। তার সাথে আছে দুর্ঘটনা জনীত কারনে ১ লক্ষ টাকার জীবন বিমা ও মরণোত্তর ৩০ হাজার টাকা পাওয়ার সুযোগ। নিঃসন্দেহে সরকারের এ এক অতিউত্তম প্রস্তাব, তবে তা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আনেক রকমের আসুবিধে ও ফাঁক-ফোকর।
বীরভূম, পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহলের আনেক গ্রামে ৩ কিলোমিটার অবধি কোন বাঙ্কের শাখা নেই। বাঙ্কের মোবাইল ভ্যান এসে তাদের নাম নিয়ে যায় এবং একটি রশিদ দিয়ে তাদের বলে ব্রাঞ্চ থেকে পাশ বই আনতে। কোন ক্ষেত্রে তাদের হাতে তৎক্ষনাৎ RuPay ডেবিট কার্ড দিয়ে যায় বাঙ্ক। তবে কাজ ছেড়ে ৩ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বাঙ্কে যাওয়ার ফুরসৎ পাননি আনেকেই। ব্যাঙ্ক কর্মীদের দেওয়া কাগজও হারিয়ে ফেলেছেন আনেকেই, তবে তাতে কোন বিশেষ আসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কয়েক মাস আগে ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলেছেন এরকম আনেকেই আছেন যারা এখনও তাদের একাউন্ট খতিয়ে দেখেননি এবং তাতে টাকাও জমা করেননি। ৮ নভেম্বরের পড়ে বাধ্য হয়ে ছুটতে হয়েছে বাঙ্কের দিকে। এইরূপ অবস্থা বিশেষ ভাবে দেখা যায় আদিবাসি সম্প্রদায়ের মধ্যে। শহরতলিতেও যারা দিন মজুর তাদেরও মধ্যেয় আনেকের এই একি অবস্থা দেখা যায়।
এই সমস্ত মানুষের মাসিক আয় খুব কম। একটু টাকা জমলে তা তারা বড় নোট করে রাখেন। সাধারনত পাঁচশো বা হাজার টাকার নোট থাকলে তা দৈনন্দিন খরচে মিশে যাওয়ার ভয় থাকে না।
গত ৮ নভেম্বর ২০১৬, সরকার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এই খবর গ্রামে পৌছতে সময় নেয় আরো এক দিন। ফাপরে পড়ে গরিব মানুষ। কাজের জায়গায় গিয়ে জানতে পারেন যে টাকা আর ছলছে না। ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিস থেকে পুরনো টাকা বদল করে আনতে হবে। জলাঞ্জলি গেল তার সেদিনের ব্যাবসা। তবে তার এক সপ্তাহের রোজগার ভারতের অর্থনীতির কিছু এসে যায় না। সপ্তাহে হাজার টাকার ব্যাবসা না হলে দেশের কোন ক্ষতি হয় না। আর ক্ষয় ক্ষতি দেখার কোন দরকারও নেই কারন সে তো ট্যাক্স পেয়ার নয়।
এই মুহূর্তে তাদের কাছে পরবর্তী প্রজন্মের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এবার দেখা দিল আরো এক স্যমস্যা। এই শ্রেণির মানুষ তাদের ছেলেদের অপর ভরসা করে উঠতে পারেন না। তাদের হাতে টাকা পয়সার জিম্মা দিলে তারা তা নিজের মত করে খরচা করা শুরু করে কোনকিছু না ভেবে। হয়তো সংসারের টাকা দিয়ে শহরে এসে সে একটা দামি জুতো কিনে ফেলল, কিম্বা বন্ধুদের সাথে কলকাতা ঘুরে বেড়াল; বাজে খরচায় নষ্ট হল চাষির কঠোর পরিশ্রম। অতএব যা করতে হবে সব নিজের আওতায় রেখে। সেই সমস্ত মানুষ যারা বাঙ্কের পে ইন স্লিপ বাড়ি থেকে অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে তার পর বাঙ্কে নিয়ে যান, তাদেরকে দিয়ে কার্ড পেমেন্ট করানো সত্যিই দুঃস্বপ্ন।
প্রায় আড়াই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষ ডিজিটাল হতে নারাজ। মোবাইল নিয়ে নিয়মিত বাজার করতে যেতে দেখা গেল না কাওকে। এগরেসিভ মার্কেটিং করা হল পেটিএম এর, যা এখন চিনা সংস্থা আলিবাবার অধিনে, মনে রাখবেন নামটা হল China যে কখনই ভারাতের ভাল চায় না। প্রায় সব দোকানেই এখন পেটিএম -এর স্টিকার লক্ষ করা যায় কিন্তু লেন দেন সেই হাতে হাতে টাকা নিয়েই হচ্ছে।
দিল্লির 'সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ'- এর প্রেসিডেন্ট ও লেখক প্রতাপ ভানু মেহতার মতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত "নৈতিক ভাবে অসংবেদনশিল"। যদিও তিনি আর্থিক উন্নতি ও কাজের সুযোগ নিয়ে বিবেচনা করে এই উক্তি করেন, সাধারন মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে মন্তব্য করলেও এই উক্তি উপযুক্ত। দেশকে এখন দু ভাগে ভাগ করা যায়- এক দেশ যার নাগরিক শহরে থাকে, তারা এ টি এম ব্যাবহার করে ও সপ্পিং মল থেকে কেনাকাটা করে, নতুন দুই হাজার টাকার নোট নিয়ে নিজস্বি তোলে; আর এক দেশ যারা গ্রামে থাকে ও শুধুমাত্র সরকারি খাতায় শিক্ষিত, যারা গ্রামের হাটে মাল বেন্ধে নিয়ে যায় ও দিনের শেষে বাড়ির জন্য দরকারি জিনিস কিনে নিয়ে আসে, যারা দিন আনে দিন খায়, নতুন দুই হাজার টাকা এবার সে কি করে মনে রাখবে আর তার নকল কি ভাবে চিনবে এই তার সংকট। এবার পরিক্ষা করতে হয় এই দুই ভাগকে দাড়ি পাল্লায় তুলে- কোন দিকটা বেশি ভারি। শহুরে বাশিন্দার কত ওজন আমরা সবাই বুঝছি কিন্তু গ্রামাঞ্চলের ওজন? সাধারন মানুষ, চাকুরিজীবি- আমরা কি জানি ও পাশের পাল্লার ওজন কত?
উত্তর আসে- 'খুব কম'। আমাদের কাছে এবিষয়ে তথ্য না থাকলেও সরকারের কাছে কিন্তু তা থাকে। এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে পরিকাঠামো, স্বচেতনতা ও প্রযুক্তি নির্ভরতা গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়, যা খুবই দুর্বল ভাবে হয়েছে। ইনফোসিস -এর প্রতিষ্ঠাতা, নন্দন নিলেকানির মতে ভারাতকে 'ক্যাশলেস ইকোনমি' বানাতে সময় লাগা উচিত ৩ বছর। আশ্চর্য জনক ভাবে সরকার মাত্র তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে দেশকে ক্যাশলেস বানাতে উদ্গ্রিব। এহেন পরিস্থিতি কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর সমান।
দেশে কর ফাকি দেওয়া অর্থ যা আছে, টাকা রূপে খুব কমই আছে। গাড়ি, বাড়ি, আশ্রয় রূপে রুপান্তরিত হয়ে আছে কাল ধনের সিংহভাগ। টাকার পর সরকার এবার বেনামী সম্পত্তি খতিয়ে দেখবে। প্রয়োজনে হয়তো বাজেয়াপ্ত করবে সেই সমস্ত বাড়ি, ফ্ল্যাট, সোনা। সাধারন মানুষের জন্য এ এক সুখবর বটে, তবে যেই পদক্ষেপে খুব কম কালোটাকা আদায় করা যায় আর মানুষের অসুবিধে বেশি হয়, সেই কর্মকাণ্ডটা শেষে করলে ভাল হত না ? ব্রি দ্রিঃ এই কর্মকাণ্ডে সর্বোপরি ৮ শতাংশ কালো টাকা উদ্ধার হয়েছে
যে দেশে শৌচাগার তৈরির জন্য প্রচার করতে হয়, বাচ্ছাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রচার করতে হয় সেই দেশের লোকজন নাকি ডেবিট কার্ড আর মোবাইল নিয়ে ক্যাশলেস হয়ে যাবে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'চন্দ্রগুপ্ত'র কথা মনে পড়ে যায়, আলেকজান্ডার প্রথম ভারত দেখে তার সেনাপতিকে বলছেন, "সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ"।
'প্রধানমন্ত্রী জন-ধন যোজনার' অধিনে পশ্চিম বাংলায় এক কোটি নব্বই লাখের বেশি RuPay ডেবিট কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। বিভিন্ন বাঙ্কের মোবাইল ভ্যান প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় গিয়ে প্রচার চালিয়ে অনেক সংক্ষক মানুষকে বাঙ্কিং পরিষেবার আধিনে নিয়ে আসে। শুধুমাত্র আধার কার্ড দিয়ে শূন্য ব্যালেন্সে বাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত বাঙ্কে। তার সাথে আছে দুর্ঘটনা জনীত কারনে ১ লক্ষ টাকার জীবন বিমা ও মরণোত্তর ৩০ হাজার টাকা পাওয়ার সুযোগ। নিঃসন্দেহে সরকারের এ এক অতিউত্তম প্রস্তাব, তবে তা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আনেক রকমের আসুবিধে ও ফাঁক-ফোকর।
বীরভূম, পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহলের আনেক গ্রামে ৩ কিলোমিটার অবধি কোন বাঙ্কের শাখা নেই। বাঙ্কের মোবাইল ভ্যান এসে তাদের নাম নিয়ে যায় এবং একটি রশিদ দিয়ে তাদের বলে ব্রাঞ্চ থেকে পাশ বই আনতে। কোন ক্ষেত্রে তাদের হাতে তৎক্ষনাৎ RuPay ডেবিট কার্ড দিয়ে যায় বাঙ্ক। তবে কাজ ছেড়ে ৩ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বাঙ্কে যাওয়ার ফুরসৎ পাননি আনেকেই। ব্যাঙ্ক কর্মীদের দেওয়া কাগজও হারিয়ে ফেলেছেন আনেকেই, তবে তাতে কোন বিশেষ আসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কয়েক মাস আগে ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলেছেন এরকম আনেকেই আছেন যারা এখনও তাদের একাউন্ট খতিয়ে দেখেননি এবং তাতে টাকাও জমা করেননি। ৮ নভেম্বরের পড়ে বাধ্য হয়ে ছুটতে হয়েছে বাঙ্কের দিকে। এইরূপ অবস্থা বিশেষ ভাবে দেখা যায় আদিবাসি সম্প্রদায়ের মধ্যে। শহরতলিতেও যারা দিন মজুর তাদেরও মধ্যেয় আনেকের এই একি অবস্থা দেখা যায়।
এই সমস্ত মানুষের মাসিক আয় খুব কম। একটু টাকা জমলে তা তারা বড় নোট করে রাখেন। সাধারনত পাঁচশো বা হাজার টাকার নোট থাকলে তা দৈনন্দিন খরচে মিশে যাওয়ার ভয় থাকে না।
গত ৮ নভেম্বর ২০১৬, সরকার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এই খবর গ্রামে পৌছতে সময় নেয় আরো এক দিন। ফাপরে পড়ে গরিব মানুষ। কাজের জায়গায় গিয়ে জানতে পারেন যে টাকা আর ছলছে না। ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিস থেকে পুরনো টাকা বদল করে আনতে হবে। জলাঞ্জলি গেল তার সেদিনের ব্যাবসা। তবে তার এক সপ্তাহের রোজগার ভারতের অর্থনীতির কিছু এসে যায় না। সপ্তাহে হাজার টাকার ব্যাবসা না হলে দেশের কোন ক্ষতি হয় না। আর ক্ষয় ক্ষতি দেখার কোন দরকারও নেই কারন সে তো ট্যাক্স পেয়ার নয়।
ক্যাশলেস ইকোনমি
এবার আসা যাক 'ক্যাশলেস ইকোনমি' নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায়। সব ধরনের লেন দেন মোবাইল দ্বারা ব্যাঙ্ক একাউন্টের মাধ্যমে করতে উৎসাহিত করছে কেন্দ্র সরকার। অত্যাধুনিক পরিষেবা যেমন UPI এবং IMPS চালু হয়ে গিয়েছে যাতে খুব সহজে দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত লেনদেন করা যায়। এই সমস্ত পরিষেবা মোবাইল ফোন দ্বারা ব্যাবহার করা যায় আর এখানেই বড় সমস্যা। এটা ঠিক যে মোবাইল ফোন এখন গরিব বড়লোক সকলের হাতে, তবে তা পরিচালনা করার ধরন শিক্ষিতের একরকম আর অশিক্ষিতের আরেক রকম। যারা এংরাজি ভাষা বোঝেনা বা ছোট স্ক্রীনে বাংলা পড়তে পারেন না, তারা ১ এ বাড়ি, ২ এ ছেলে, ৩ এ মেয়ে- এই ভাবে মুখস্ত করে রাখেন। ১ টিপে সবুজ চাপলে বাড়িতে ফোন যাবে আর লাল দিয়ে ফোন কাটতে হবে- প্রযুক্তিকে এইভাবেই সহজ করে চালিয়ে যাচ্ছেন বহু মানুষ, বিশেষ করে যারা পঞ্চাশ উর্দ্ধ। এই সমস্ত মানুষকে UPI চালনা শেখানো বড়ই কঠিন আর ইন্টারনেট বাঙ্কিং তাদের পক্ষে অসম্ভব ধরে নেওয়াটাই শ্রেয়। উপরন্তু এই সমস্ত উন্নত মানের প্রযুক্তিতে এই সমস্ত মানুষের একপ্রকার অনীহা দেখা যায়। তার কারনটাও খুব সাধারন। যে বিষয়টা তাদের শিক্ষার বাইরে, আওত্তের বাইরে, টাকা পয়শার ব্যাপারে সেখানে আস্থা না থাকাটাই স্বাভাবিক। তারা এটাও জানেন যে একটু ভুল হয়ে গেলে তাদের টাকা নয় ছয় হয়ে যেতে পারে। অতএব হাতে টাকা তারা বেশি পছন্দ করেন ও স্বচ্ছন্দ অনুভব করেন।এই মুহূর্তে তাদের কাছে পরবর্তী প্রজন্মের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এবার দেখা দিল আরো এক স্যমস্যা। এই শ্রেণির মানুষ তাদের ছেলেদের অপর ভরসা করে উঠতে পারেন না। তাদের হাতে টাকা পয়সার জিম্মা দিলে তারা তা নিজের মত করে খরচা করা শুরু করে কোনকিছু না ভেবে। হয়তো সংসারের টাকা দিয়ে শহরে এসে সে একটা দামি জুতো কিনে ফেলল, কিম্বা বন্ধুদের সাথে কলকাতা ঘুরে বেড়াল; বাজে খরচায় নষ্ট হল চাষির কঠোর পরিশ্রম। অতএব যা করতে হবে সব নিজের আওতায় রেখে। সেই সমস্ত মানুষ যারা বাঙ্কের পে ইন স্লিপ বাড়ি থেকে অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে তার পর বাঙ্কে নিয়ে যান, তাদেরকে দিয়ে কার্ড পেমেন্ট করানো সত্যিই দুঃস্বপ্ন।
প্রায় আড়াই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মানুষ ডিজিটাল হতে নারাজ। মোবাইল নিয়ে নিয়মিত বাজার করতে যেতে দেখা গেল না কাওকে। এগরেসিভ মার্কেটিং করা হল পেটিএম এর, যা এখন চিনা সংস্থা আলিবাবার অধিনে, মনে রাখবেন নামটা হল China যে কখনই ভারাতের ভাল চায় না। প্রায় সব দোকানেই এখন পেটিএম -এর স্টিকার লক্ষ করা যায় কিন্তু লেন দেন সেই হাতে হাতে টাকা নিয়েই হচ্ছে।
দিল্লির 'সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ'- এর প্রেসিডেন্ট ও লেখক প্রতাপ ভানু মেহতার মতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত "নৈতিক ভাবে অসংবেদনশিল"। যদিও তিনি আর্থিক উন্নতি ও কাজের সুযোগ নিয়ে বিবেচনা করে এই উক্তি করেন, সাধারন মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে মন্তব্য করলেও এই উক্তি উপযুক্ত। দেশকে এখন দু ভাগে ভাগ করা যায়- এক দেশ যার নাগরিক শহরে থাকে, তারা এ টি এম ব্যাবহার করে ও সপ্পিং মল থেকে কেনাকাটা করে, নতুন দুই হাজার টাকার নোট নিয়ে নিজস্বি তোলে; আর এক দেশ যারা গ্রামে থাকে ও শুধুমাত্র সরকারি খাতায় শিক্ষিত, যারা গ্রামের হাটে মাল বেন্ধে নিয়ে যায় ও দিনের শেষে বাড়ির জন্য দরকারি জিনিস কিনে নিয়ে আসে, যারা দিন আনে দিন খায়, নতুন দুই হাজার টাকা এবার সে কি করে মনে রাখবে আর তার নকল কি ভাবে চিনবে এই তার সংকট। এবার পরিক্ষা করতে হয় এই দুই ভাগকে দাড়ি পাল্লায় তুলে- কোন দিকটা বেশি ভারি। শহুরে বাশিন্দার কত ওজন আমরা সবাই বুঝছি কিন্তু গ্রামাঞ্চলের ওজন? সাধারন মানুষ, চাকুরিজীবি- আমরা কি জানি ও পাশের পাল্লার ওজন কত?
উত্তর আসে- 'খুব কম'। আমাদের কাছে এবিষয়ে তথ্য না থাকলেও সরকারের কাছে কিন্তু তা থাকে। এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে পরিকাঠামো, স্বচেতনতা ও প্রযুক্তি নির্ভরতা গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়, যা খুবই দুর্বল ভাবে হয়েছে। ইনফোসিস -এর প্রতিষ্ঠাতা, নন্দন নিলেকানির মতে ভারাতকে 'ক্যাশলেস ইকোনমি' বানাতে সময় লাগা উচিত ৩ বছর। আশ্চর্য জনক ভাবে সরকার মাত্র তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে দেশকে ক্যাশলেস বানাতে উদ্গ্রিব। এহেন পরিস্থিতি কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানোর সমান।
দেশে কর ফাকি দেওয়া অর্থ যা আছে, টাকা রূপে খুব কমই আছে। গাড়ি, বাড়ি, আশ্রয় রূপে রুপান্তরিত হয়ে আছে কাল ধনের সিংহভাগ। টাকার পর সরকার এবার বেনামী সম্পত্তি খতিয়ে দেখবে। প্রয়োজনে হয়তো বাজেয়াপ্ত করবে সেই সমস্ত বাড়ি, ফ্ল্যাট, সোনা। সাধারন মানুষের জন্য এ এক সুখবর বটে, তবে যেই পদক্ষেপে খুব কম কালোটাকা আদায় করা যায় আর মানুষের অসুবিধে বেশি হয়, সেই কর্মকাণ্ডটা শেষে করলে ভাল হত না ? ব্রি দ্রিঃ এই কর্মকাণ্ডে সর্বোপরি ৮ শতাংশ কালো টাকা উদ্ধার হয়েছে
যে দেশে শৌচাগার তৈরির জন্য প্রচার করতে হয়, বাচ্ছাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রচার করতে হয় সেই দেশের লোকজন নাকি ডেবিট কার্ড আর মোবাইল নিয়ে ক্যাশলেস হয়ে যাবে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'চন্দ্রগুপ্ত'র কথা মনে পড়ে যায়, আলেকজান্ডার প্রথম ভারত দেখে তার সেনাপতিকে বলছেন, "সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ"।
Great!!!!!!!Love it
ReplyDelete