Skip to main content

তিলে তিলে বাড়ছে সাম্প্রদায়িক অসহিস্নুতা, দাঙ্গার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বাংলা




উত্তর প্রাদেশের হাওয়া এখান বইতে শুরু করেছে পশ্চিম বাংলাতেও। শুরু হয়ে গেছে তলোয়ার প্রদর্শনী, সাদা জামা পড়ে 'জয় শ্রী রাম' শ্লোগান এখান হয়তো শোনা যাবে হামেশাই। ২০১৭র রাম নবমির কলকাতা একত্রিত হিন্দু শক্তির প্রদর্শনীর। কেন দরকার পড়ল অস্ত্র নিয়ে রাস্তা হাঁটার? সব হিন্দু কি শক্তি প্রদর্শন করতে ভালবাসছেন?

প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিলে আপনার কাছে আসতে পারে দুই ধরনের উত্তর। একটা উত্তর আসবে গেরুয়া রঙ মাখানো (যদি আপনি হিন্দু হন), খুব রাগের সাথে এসে আপনাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে যে আপনি সুযোগ সুবিধা থেকে বিতারিত আর এখন বদলা নেওার সময় চলে এসেছে।

২০১৭ সালের রাম নবমী মটেও খুব একটা ভাল কাটেনি কলকাতায়। জায়গায় জায়গায় তলোয়ার হাতে এক সর্বভারতীয় পার্টির কর্মীরা শোভাযাত্রা করেন ও 'জয় শ্রী রাম' শ্লোগানে লোক জাগিয়ে তোলেন। এর ফলে বচসা হয় রাজাবাজার এলাকায়, খুনোখুনি হয় ক্ষিদিরপুর এলাকাতেও। বাঙ্গালির প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা, রামনবমী নয়। পূর্বে রাম নবমীর তিথিতে এরকম মিছিল বাংলার কোথাও বেরতে দেখা যায় নি। রাম নবমী একান্তই  পশ্চিম অঞ্চলের উৎসব। তবে রাম নবমী বাংলার কিছু কিছু জায়গায় বহু বছর ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে, যেমন- হাওড়ার রামরাজাতলা, আসানসোল ইত্যাদি। আচমকা রাম নবমীতে এত ভক্তি কলকাতা বাসির মনে কি করে জেগে উঠল? এই ভক্তি নিতান্তই শিখিয়ে দেওয়া ভক্তি নয় কি? এই জালি ভক্তির নেপথ্যে আছে রাজনৈতিক কৌশল ও লাভ।
source: The Indian Express


অস্ত্র শুভাকাঙ্ক্ষী লোকেদের যখন জিজ্ঞেস করা হয় রাম নবমীতে তলোয়ার এর  দরকারটা কি তখন তারা উদাহরন টেনে আনতেনে হানাফি মুসলমানদের মহরম উৎসবের। মহরমে লাঠি ও তলোয়ার নিয়ে শোভাযাত্রা হয়, ঢোল এর তালে লাঠিয়ালরা নাচ করে, তরওয়ালবাজরা দেখায় আনেক রকমের কেরামতি। যে কথাটা অস্ত্রপ্রেমী রাম ভক্তরা মানতে চাইবেন না সেটা হল যে মহরমের এই তলোয়ার নিয়ে খেলা এক সম্প্রদায়ের মুসলিমদের রীতি ও রেওয়াজের মধ্যে পড়ে। তাদের কাছে মহরমের এই উৎসব এক ঐতিহাসিক কারবালা যুদ্ধের অনুকরন ও তা স্মরনে রাখার রেওয়াজ, আর এই রেওয়াজ যুগযুগ ধরে চলে আসছে হানাফি মুসলমানদের মধ্যে। অস্ত্র নিয়ে রাম নবমীর দিন হাঁটা হিন্দু রীতিতে কখনই ছিল না। বলাই বাহুল্য ভগবান রাম হিন্দুদের অস্ত্র চালনার নির্দেশ কখনই দেন নি। তবে হঠাৎ কেন এত অস্ত্র ভালবাসা?
 রাম নবমীর তিথি শুধু একটি টোপ মাত্র। অস্ত্র প্রদর্শনী আসলে জনসাধারনকে ক্ষমতা দেখানোর একটি প্রয়াস। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী লোকজনকে একত্রিত করে তা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে চালনা করার হাতিয়ার হল এই নতুন রাম নবমী উৎযাপন।

ধর্মীও অস্ত্রপ্রেমীদের মতে এখনকার সমাজে অস্ত্র তুলে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। তাদের মতে অন্য ধর্মের বাড়বাড়ন্ত অনেক বেড়েছে আর তাই নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র তুলে নিতে তারা বাধ্য। তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন- কি এমন সঙ্কট হল দেশে যে সবাইকে অস্ত্র তুলে নিতে হবে?

ভারতবর্ষের তাবর তাবর দুই ধর্মের অনুসরণকারীদের মধ্যে দাঙ্গা অনেক বার প্রাকাশ পেয়েছে, এ কথা অবান্তর নয়, তবে এটাও সত্যি যে ভারতের 'ধর্ম নিরপেক্ষ' ভূমিতে এই অসুখ শুধু মাত্র কিছু কিছু জায়গায় দেখা যায়। দেশের প্রতিটি মানুষ দাঙ্গার শিকার নয়, ৬৪০টি জেলার মধ্যে কিছু জেলা ঐতিহাসিক দাঙ্গার স্মৃতি বহন করে। সমগ্র দেশ যদি এখন কোন এক সাম্প্রদায়িক হিংসা ভয় করে অস্ত্র তুলে নেয় প্রতিরক্ষা ও পাল্টা জবাবের জন্য, যেই হিংসার অস্তিত্ব এখনও প্রকাশ পায় নি তাহলে ব্যাপারটা অসুখের আগেই ওষুধের মত হয়ে দাড়াবে। এর ফলাফল?

অস্ত্র হাতে নিয়ে কখনো শান্তির কথা বলা যায় না। এক বার অস্ত্র তুলে নেওয়া মানে শান্তির পথ থেকে ক্রমে দূরে সরে আসা। অস্ত্র হিংসার প্রতিক আর অস্ত্র মানেই যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।

পশ্চিম বাংলার পুলিশ প্রশাসন ও সরকার এইরূপ গেরুয়া অস্ত্র প্রদর্শনী মিছিলের উপর কড়া ব্যাবস্থা নিয়েছে। Arms Act 1959এর অধিনে কোন মানুষ বা গোষ্ঠীর বেপরোয়া অস্ত্র দেখানতে ৬ মাস পর্যন্ত জেল হতে পারে। অতি-জাতীয়তাবাদি এক সর্বভারতীয় পার্টির প্রথম সারির কিছু নেতা গ্রেফতার হন এই অপরাধের ভিত্তিতে। এনটালি, ভবানিপুর, পোস্তা ও খরগপুরে পুলিশ গ্রেফতার করেছে অনেক অস্ত্র প্রেমীকে।
source: Hindustan Times

 স্বসস্ত্র রাম ভক্তদের হাতিয়ারের কারন সুধালে তারা খাড়া করে নানা রকমের যুক্তি। বিভিন্ন জায়গায় তলোয়ার হাতে নিয়েছেন মহিলারাও। তাদের দাবি ইতিহাসে এর আগেও মহিলারা বহুবার অস্ত্র তুলেছেন বিভিন্ন কারনে। নারী শক্তি হিন্দু ধর্মের এক অতি-শক্তিশালি বৈশিষ্ট যা দেব দেবীর থেকে মানুষের মধ্যে চলে আসছে। তবে ইতিহাসে মহিলারা পরাধীনতার  বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন, রাম রাজত্বের জন্য তোলেননি নিশ্চই। এই মুহূর্তে কোন ধর্মযুদ্ধ বা সঙ্কট দেখা যাচ্ছে না যে সেই সঞ্চিত নারীশক্তির দরকার পরবে। এর পেছনে লক্ষ একটাই- আরও বেশি সংখ্যক মানুষের হাতে অস্ত্র দিয়ে, তাদেরকে রাস্তা হাঁটিয়ে শ্লোগানের মধ্যে দিয়ে তাদের ভেতর ধ্বংসাত্মক চেতনা তৈরি করা, যার আনুঘটক হল ধর্ম।

যখন নারী গেল তখন শিশু বাদ যায় কেন? শিশুদের হাতেও উঠে গেল অস্ত্র যার ছবি এখন প্রায়ই ইন্টারনেটে দেখা যায়। বাচ্চাদের হাতে এখন আমরা বড়রা অস্ত্র তুলে দেব আর পালন করব শিশুদিবস। এই সবকিছুই এখন সম্ভব আমার আপনার হিরক রাজার দেশে।

বাঙ্কে সুধের হার বাড়ছে, দেশে আরও অনেক ছোটখাটো সামশ্যা দেখা দিচ্ছে, এমন সময় ধর্ম নিয়ে বাড়বাড়ন্ত মানুষকে এই সমস্ত অসুবিধে থেকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা কি? অন্য জায়গায় ব্যাস্ত করে প্রতিবাদ দমনের কৌশল কি?

সব কর্মকাণ্ডই রাজনৈতিক কারনে যুক্ত। এক সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এটা এক ধর্মীও সঙ্কট হিসেবে পেশ করা হচ্ছে। অতীতে এরকম উদহারন অনেকি আছে। সিরিয়াতে মানুষের কাছে একটাই ধারনা ছিল যে তাদের সম্প্রদায়ের উপর আক্রমন করা হয়েছে। তারা এটাই জানত যে আমেরিকা তাদেরকে খুন করছে, আর এভাবেই সত্যের বিকৃতকরণ করা হয়েছিল।

অস্ত্রমিছিলে হিন্দু গলাবাজি ভারতের ঐক্যতার উপর একটা বড়সড় আঘাত হানে। এই ঐক্য আমাদের গড়ার দায়িত্ব, ভাঙার নয়। দাঙ্গা মোটেও শুভ নয়। 
cover picture source: TheSmartLocal

Comments

  1. হিরক রাজার দেশের গল্প বলতেই মনে পড়ে গেল সত্যজিৎ বাবুর কথা । অনার বানানো দেশে ছিল দুজন গায়ক যাদের গান শুনত সবাই, একদম চুপচাপ করে বসে । আমাদের দেশেও অনেক গুপি বাঘা আছে বটে তবে তারা অন্য কারো ভয়ে নিজেদের গান গুলো ভুলে যায় । বাস্তবেই চলছে রাজার পাট । আসলে গণতন্ত্র কে দূষিত আমরাই করেছি নিজেদের দোষ টা কোথায় সেইটা বিচার করবার সময় হয়ে এসছে । তবে এইটা বোঝার ক্ষমতা আসেনি এখনও তাই অপেক্ষা বন্ধু আরো অপেক্ষা করতে হবে । আরো প্রাণ যাবে তার মধ্যে হয়ত আমি কিম্বা তুইও হতে পারি । তবু আমরা অপেক্ষা করব ।

    ReplyDelete
  2. কি আবোলতাবোল বকছেন? ভারতের মানুষকে নিরস্ত্র করে ব্রিটিশরাজ। আসলে অস্ত্রের প্রতি ভক্তিমূলক দেশ যা পৃথিবীতে আজ এই অস্ত্রপ্রেমের বাড়াবাড়ির জন্যে কুখ্যাত হয়ে উঠছে, তাদের এই অস্ত্রপ্রেমের উৎস হচ্ছে ব্রিটিশদের ভারত দখলের সফলতা। আইনকানুন নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে চলবে না। মানুষ আদিমাত্রে চায় সুরক্ষিত জীবন। সমাজ সরকার ইত্যাদি আমরা গঠন করি একজোট হয়ে সে আদিতম চাহিদাকে আরও সফল করতে। কিন্তু সেই আইনব্যবস্থা যখন মানুষকে রক্ষা দিতে অসফল হয়ে ওঠে, তখন সে মানুষের কাছে আপনার আইনের কোন মূল্য থাকে না। রাজনৈতিক কারণে আপনি যদি মুস্লিম গুন্ডাগিরি এবং তালেতালে হিন্দুকে পশ্চিমবাংলায় জেলায় জেলায় জোড় করে সঙ্খ্যালঘু করার তালে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ হাতে অস্ত্র নেবেই।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

দেশ ভাগ হল দুই ভাগে- India ও ভারত। দৃষ্টিপাত করুন নোট বাতিলের গভীরে

                                   দেশ ভাগ হল দুই ভাগে প্রাধানমন্ত্রি নরেন্দ্র মোদীর মুদ্রাহিতকরণ সিদ্ধান্ত আজ কাল আর খবরে আসে না। দেশ জুড়ে কমতে লেগেছে এ টি এম এর লাইন। ব্যাঙ্কের শাখা গুলতেও কমেছে মানুষের ভীড় যদিও রোদে দাঁড়িয়ে দেহত্যাগ করতে হয়েছে বেশ কিছু প্রবীণ নাগরিককে। প্রত্যক্ষ ও পরক্ষ ভাবে নোট বাতিলের সাথে জড়িত মৃত্যু হয়েছে মোট ৩৩ জনের। কেন এইরূপ হেনস্থা তার কোন জবাব নেই। হেনস্থা যে শেষ হয়ে গেছে তা নয়। মানুষের আসুবিধে বুঝতে শহরতলি ছেড়ে গ্রাম বেড়িয়ে আসতে হয়। সেই সমস্ত গ্রাম যেখানে ২ কিলোমিটার অবধি কোন ব্যাঙ্ক নেই। হাতে পাঁচটা এ টি এম কার্ড থাকলেও শুক্রবার হাটে নেই তা ব্যাবহার করার পরিষেবা। সেই সমস্ত নিরক্ষর চাষি, যারা এখনও সই মুখস্ত করে উঠতে পারে নি, বা আদিবাসী সম্প্রদায় যারা হঠাৎ করে একদিন জানতে পারে যে তাদের ঘরের সমস্ত পাঁচশ আর হাজার টাকা কাগজ হয়ে গেছে।       'প্রধানমন্ত্রী জন-ধন যোজনার' অধিনে পশ্চ...